বোরকা পরা কি আল্লাহর হুকুম?

আমাদের সমাজে সুন্নি ও শিয়া আলেমদের জীবনের বিরাট অংশ কেটে যায় শুধু নারীদের পোশাকের দৈর্ঘ্য মাপতে মাপতে। তারা সাধারণত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করা পছন্দ করে না, একবিংশ শতাব্দীতে এসেও তাদের গবেষণার একমাত্র বিষয়বস্তু হলো মেয়েদের পোশাক।

যেখানে বিধান দেওয়ার ক্ষমতা হলো একমাত্র আল্লাহর, সেখানে দেখা যায় এসকল ধর্মগুরুরা নিজেরাই একেকজন বিধানদাতা সেজে বসে আছে। এদের কথার সাথে আল্লাহর দেওয়া কুরআনের কথার কোনো মিল পাওয়া যায় না।

এবার এদের কথা উপেক্ষা করে, আল্লাহ প্রদত্ত সংবিধান কুরআনে মেয়েদের পোশাকের ব্যাপারে কি কি বলা আছে সেগুলোই জেনে নেয়া যাক।

১. “আর বিশ্বাসী নারীদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে। তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে, সাধারণভাবে যা প্রকাশিত থাকে তা ব্যতীত। তারা যেন ‘খুমুর’ দ্বারা তাদের ‘জুইউব'(ক্লিভেজ) আবৃত রাখে।” [২৪:৩১]

সুরা নুরের ৩১ নং আয়াতে আল্লাহ নারীদের পোশাক পরিধানের সব গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি খুব সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন।

আয়াতটির যে লাইনের অর্থ সবচেয়ে বেশি বিকৃত করা হয় তা হলো ‘ইয়াদরিবনা বি-খুমুরিহিন্না আ’লা জুইউবিহিন্না’। সাধারণত এই লাইনের অনুবাদ করা হয় ‘তারা যেন ওড়না দ্বারা তাদের বক্ষদেশ আবৃত রাখে।’ আরেকটি অনুবাদ আছে আরও একধাপ আগানো: ‘তারা যেন মাথার কাপড় দ্বারা তাদের বক্ষদেশ আবৃত রাখে’!
উক্ত আয়াতে কি কোথাও ‘রা’স'(মাথা) বা ‘শা’র'(চুল) শব্দটির উল্লেখ আছে?—নেই।

উক্ত আয়াতে ব্যবহৃত খুমুর (‘খিমার’ বা ‘খিমির’ শব্দের বহুবচন) এর প্রকৃত অর্থ হলো ‘আবরণ’ বা ‘যা কোনো কিছুকে ঢেকে রাখে’। যেকোনো পোশাক বা কাপড়ই খিমার হতে পারে। কুরআনে মদ/মাদক বোঝাতে ‘খমর’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে (২:২১৯), কেননা মদ মানুষের চেতনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।

এছাড়াও ‘জুইউব’ শব্দের অনুবাদ করা হয় ‘বক্ষদেশ’। তবে প্রকৃতপক্ষে ‘জুইউব’ শব্দ দ্বারা সম্পূর্ণ ‘বুক’ বা ‘বক্ষদেশ’ বুঝায় না। ‘জুইউবিহিন্না’ শব্দের প্রকৃত অর্থ হলো নারীদের বুকের উপরের অংশ/ক্লিভেজ।

ইসলামপূর্ব যুগে আরব নারীরা তাদের বুকের উপরের অংশ অনাবৃত রাখতো, বর্তমান যুগের হলিউড-বলিউড অভিনেত্রীরা যেমন অর্ধবক্ষ উন্মুক্ত রাখে অনেকটা সেরকম। সুরা নুরের ৩১ নং আয়াতে আল্লাহ এই জিনিসটিই নিরুৎসাহিত করেছেন। অর্থাৎ, এই কথা পরিষ্কার যে ক্লিভেজ ঢাকা থাকে এমন যেকোনো মার্জিত পোশাক মেয়েদের জন্য অনুমোদিত। তা হতে পারে কামিজ, শার্ট, টিশার্ট, ব্লাউজ, শাড়ি, চাদর, জ্যাকেট বা অনুরূপ যেকোনো পোশাক।

কুরআনে আল্লাহ নারীদেরকে সুনির্দিষ্টভাবে তাদের বক্ষ/ক্লিভেজ ঢেকে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, এটি থেকেই বোঝা যায় যে শরীরের আরও অন্যান্য অংশ আছে যেগুলো খোলা রাখা নারীদের জন্য বৈধ। আপাদমস্তক ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক হলে সেটা তো আল্লাহ সরাসরিই উল্লেখ করে দিতেন। যদি কেউ আপনাকে ডেকে বলে, ‘বাগানের ওই ফুল গাছটিতে পানি দাও’, এর অর্থ কি তিনি আপনি পুরো বাগানেই পানি দিতে বাধ্য নাকি শুধু ওই নির্দিষ্ট গাছটিতে?

জেনে রাখা ভালো যে, কুরআনে ৭টি স্থানে হিজাবের কথা বলা হয়েছে (৭:৪৬;৩৩:৫৩;৩৮:৩২;৪১:৫;৪২:৫১;১৭:৪৫ এবং ১৯:১৭), এবং কোনো স্থানেই হিজাব মানে ‘মাথার কাপড়’ বোঝায় না। ইনফ্যাক্ট, হিজাবের সাথে পোশাক-পরিচ্ছদের কোনো সম্পর্কই নেই। কুরআনে সকল জায়গায় ‘হিজাব’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে দেয়াল বা আড়াল বোঝাতে।

বোরকা পরা বা মাথা ঢাকার নিয়ম পালন করতো ইহুদি নারীরা। হাদিসের মাধ্যমে যেসব ইহুদি রীতিনীতি মুসলিমদের মাঝে ঢুকে যায় তার মধ্যে বোরকা পরাও একটি।

কুরআনের আরেকটি আয়াতে মেয়েদের পোশাক নিয়ে কিছু কথা বলা আছে:

২. “হে নবী, তোমার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে এবং মুমিন নারীদেরকে বলো তারা যেন তাদের জিলবাব(পোশাক) এর কিছু অংশ তাদের উপর দিয়ে নামিয়ে রাখে।এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে এবং তাদের ক্ষতি করা হবে না। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [৩৩:৫৯]

উক্ত আয়াতে ব্যবহৃত ‘ইউদনিনা’ শব্দের অর্থ হলো ‘নামিয়ে দেওয়া’। আর ‘জিলবাব’ মানে হলো ‘বহিঃস্থ পোশাক’ বা ‘আউটার গার্মেন্ট’। অনেকে ‘জিলবাব’ এর অনুবাদ করে ‘এমন পোশাক যা সারা শরীর ঢেকে ফেলে’! তারা এটা বুঝতে পারে না যে, যেই পোশাক মাথা থেকে পা পর্যন্ত নেমে মাটি স্পর্শ করে ফেলেছে তার আরও কিছু অংশ কীভাবে নামিয়ে দেয়া সম্ভব?

বস্তুত, এই আয়াতে আল্লাহ মেয়েদের পোশাকের নির্দিষ্ট কোনো দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করে দেননি। আল্লাহ বলেছেন পোশাক নামিয়ে রাখতে, কিন্তু কতটুকু পর্যন্ত নামাতে হবে তা নির্দিষ্ট করে দেননি। কোন পরিবেশে কতটুকু দৈর্ঘ্যের জামা পরিধান করতে হবে তা একটা মেয়ে নিজে থেকেই ঠিক করে নিতে পারবে।

পোশাকের দৈর্ঘ্য সমাজ, কালচার ও পরিবেশভেদে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। একটা মেয়ে যখন বাহিরে যাবে তখন হয়তো সে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ঢেকে রাখে এমন জামা পরবে।যখন সে ফ্যামিলি বা বান্ধবীদের সাথে থাকবে তখন হয়তো হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ঢাকা থাকে এমন জামা পরবে। আবার, যখন একটা মেয়ে মাঠে টেনিস বা ফুটবল খেলতে যাবে তখন হয়তো তার পোশাকের দৈর্ঘ্য আরো কিছুটা কম হবে।

আল্লাহ কুরআনে কোথাও নির্দিষ্ট একটি পোশাক বাধ্যতামূলক করেননি। যদি এমনটা করতেন তাহলে ঘরে, বাইরে, অফিসে, স্কুলে, উৎসবে বা ফ্যামিলি ফাংশনে শুধু এক ধরণের পোশাকই পরতে হতো। বরং আল্লাহ পোশাকের কিছু মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। উক্ত মূলনীতি গুলো জানা থাকলেই,একজন বিশ্বাসী মেয়ে নিজে থেকেই বুঝতে পারবে তার জন্য কোন পরিবেশে কোন পোশাক উপযুক্ত ও মানানসই।

আর, যারা খোদার উপর খোদকারি করতে পছন্দ করে, যারা কুরআনের বাইরে গিয়ে বিধি-বিধান বানায় আর যারা সেগুলো মানে তারা সবাই আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করার অপরাধে অপরাধী। তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন:

[৪২:২১] “নাকি তাদের এমন কতগুলো শরীক আছে, যারা তাদের জন্য দ্বীনের এমন বিধান প্রণয়ন করে যার অনুমতি আল্লাহ দেননি?”

[42:21] “Or do they have partners, who legislate for them of the religion which God did not authorize?”