উইল ও উত্তরাধিকার: শরিয়া আইন বনাম কুরআনের আইন

বিভিন্ন মুসলিম দেশের শরিয়া আদালতগুলো যে আইনের মাধ্যমে বিচারকাজ পরিচালনা করে, সেগুলো কি আসলেই আল্লাহর আইন? শরিয়া আদালত থেকে যে রায়গুলো আসে প্রকৃতপক্ষে সেগুলো কি কুরআনসম্মত, নাকি সেগুলো কুরআনের নামে চাপিয়ে দেয়া কিছু মানব রচিত বিধান?—প্রথমে এই সংক্রান্ত একটি ঘটনা শোনা যাক।

ঘটনাটি হলো: একজন মুসলিম ব্যক্তি তার মৃত্যুর আগে তার সম্পদের ৫০% তার মেয়ের নামে উইল করে দিয়ে যান। কিন্তু ঐ ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার দুই ছেলে এই উইলকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আদালতে আবেদন করে যে, এটি ইসলামী আইনের পরিপন্থী। শরিয়া আদালত তাদের আবেদন গ্রহণ করে এবং মৃত ব্যক্তির উইলটিকে বাতিল বলে ঘোষণা করে। আদালত নির্দেশ দেয় যে, সম্পদ কুরআনে বর্ণিত নির্দিষ্ট অনুপাতেই বণ্টন করতে হবে (পুত্র কন্যার দ্বিগুণ পাবে)। ফলে, মেয়ে তার ভাইদের তুলনায় অর্ধেক সম্পত্তি পায়, এবং পিতার শেষ ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে যায়।

প্রশ্ন হলো—শরিয়া আদালতের এই রায় কি সত্যিই কুরআনের আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল? নাকি এটি আল্লাহর বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন? আসুন কুরআনের আলোকে ঘটনাটি বিশ্লেষণ করে দেখি।

পবিত্র কুরআনে উত্তরাধিকার বণ্টনের বিস্তারিত নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। যেমন, সূরা আন-নিসায় (৪:১১-১২) পুত্র-কন্যার অংশ, পিতা-মাতার অংশ ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো—প্রতিটি আয়াতেই বারবার বলা হয়েছে উত্তরাধিকারের অংশগুলো প্রযোজ্য হবে ওসিয়ত পালন ও ঋণ পরিশোধের পর।

“আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের (উত্তরাধিকার) সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন: এক ছেলের অংশ দুই মেয়ের অংশের সমান। কিন্তু যদি কেবল নারীই থাকে তবে দুইয়ের অধিক মেয়ের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ। আর যদি মেয়ে কেবল একজন হয়, তবে তার জন্য অর্ধেক। আর মৃতের পিতা-মাতার প্রত্যেকের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির ছয়ভাগের একভাগ, যদি তার সন্তান থাকে। কিন্তু যদি তার সন্তান না থাকে এবং কেবল পিতা-মাতাই উত্তরাধিকারী হয়, তবে তার মায়ের জন্য তিনভাগের একভাগ। আর যদি তার ভাই-বোন থাকে, তবে তার মায়ের জন্য ছয়ভাগের একভাগ। এ সবই সে যা ওসিয়ত করে গেছে তা পালন করার এবং ঋণ পরিশোধ করার পর।তোমাদের পিতা ও সন্তানদের মধ্যে উপকারের দিক থেকে কে তোমাদের বেশি নিকটবর্তী, তা তোমরা জানো না। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”—(৪:১১)

“তোমাদের স্ত্রীদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির অর্ধেক তোমাদের জন্য, যদি তাদের কোনো সন্তান না থাকে। কিন্তু যদি তাদের সন্তান থাকে, তবে তাদের রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে তোমাদের জন্য চারভাগের একভাগ; তারা যে ওসিয়ত করে গেছে তা পালন এবং ঋণ পরিশোধের পর। আর তোমাদের স্ত্রীদের জন্য তোমাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির চারভাগের একভাগ, যদি তোমাদের কোনো সন্তান না থাকে। কিন্তু যদি তোমাদের সন্তান থাকে, তবে তোমাদের রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে তাদের জন্য আটভাগের একভাগ; তোমরা যে অসিয়ত করেছ তা পালন এবং ঋণ পরিশোধের পর। আর যদি কোনো পুরুষ বা নারী ‘কালালাহ’ হয় (অর্থাৎ যার সন্তান নেই) এবং তার থাকে এক ভাই অথবা এক বোন, তবে তাদের প্রত্যেকের জন্য ছয়ভাগের একভাগ। কিন্তু তারা যদি এর চেয়ে অধিক হয়, তবে তারা সবাই তিনভাগের একভাগে অংশীদার হবে; যে ওসিয়ত করা হয়েছে তা পালন এবং ঋণ পরিশোধের পর—যদি তা কারো জন্য ক্ষতিকর না হয়। এ আল্লাহর নির্দেশ; আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও পরম সহনশীল।”—(৪:১২)

  • ওসিয়ত কী?—একজন ব্যক্তি মৃত্যুর পূর্বে তার সম্পদের বিভিন্ন অংশ কীভাবে ও কাকে কতটুকু পরিমাণে দেওয়া হবে সে ব্যাপারে একটি ইচ্ছাপত্র লিখে যান, এই লিখিত নির্দেশনাটিকেই ওসিয়ত বলা হয়, ইংরেজিতে যাকে আমরা উইল বলি। (যদিও ওসিয়ত মৌখিকভাবেও হতে পারে, তবে সেক্ষেত্রে সেটি প্রমাণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় এবং বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই লিখিতভাবে ওসিয়ত করে যাওয়াই অধিক নিরাপদ।)

উপরে উল্লিখিত আয়াতগুলো থেকে একটি জিনিস পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে, কুরআনে বর্ণিত উত্তরাধিকারের অনুপাতগুলো শুধুমাত্র তখনই কার্যকর হবে, যখন প্রথমে মৃত ব্যক্তির উইল সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হবে এবং তার ঋণ পরিশোধ করা হবে। উইল ও ঋণকে এখানে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, কুরআনে বর্ণিত উত্তরাধিকারের অংশগুলোর বিধান কার্যকর হয় শেষে, যখন মৃতের উইল ও ঋণের বাধ্যবাধকতা পূর্ণ হয়ে যায়।

সূরা আল-বাকারায় (২:১৮০) আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেন:

“তোমাদের কারো যখন মৃত্যু উপস্থিত হয়, যদি সে ধন-সম্পদ রেখে যায়, তবে তার জন্য পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য ন্যায়সঙ্গতভাবে (বিল মা’রুফি) ওসিয়ত করা বিধিবদ্ধ করা হলো (কুতিবা আলাইকুম); এটি মুত্তাকীদের জন্য একটি আবশ্যিক কর্তব্য।”—(২:১৮০)

এই আয়াতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়:

  • ওসিয়ত লেখা বাধ্যতামূলক: এটি কোন ঐচ্ছিক কাজ নয়, বরং আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত একটি আবশ্যিক দায়িত্ব।
  • উইলের পরিমাণে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই: ওসিয়ত করার সময় কতটুকু সম্পদ ওসিয়ত করা যাবে বা কাকে ঠিক কত অংশ দিয়ে যেতে হবে—তার কোনো সীমা আল্লাহ নির্ধারণ করে দেননি। আল্লাহ যদি উইলের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো পরিমাণ বা সীমা নির্ধারণ করতে চাইতেন, তবে কুরআনে তিনি তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে দিতেন। যেহেতু তিনি তা করেননি, তাই এর অর্থ হলো—সম্পদের যেকোনো অংশের ওপর উইল/ওসিয়ত করা যাবে।
  • ওসিয়ত হতে হবে ন্যায়সঙ্গত: আয়াতটিতে “ন্যায়সঙ্গতভাবে” কথাটির দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, ব্যক্তি তার উত্তরাধিকারী বা নিকটাত্মীয়দের প্রয়োজন অনুযায়ী সুষমভাবে সম্পদ বন্টন করে উইল রচনা করবেন। উদাহরণস্বরূপ, যদি এক সন্তান আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হয় এবং অপর সন্তান অভাবগ্রস্ত হয়, তবে অভাবগ্রস্ত সন্তানকে বেশি দেওয়া ন্যায়সঙ্গত হবে। এটি উইলকারী ব্যক্তির বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

উপরের আয়াতগুলো একসাথে পড়লে একটি সমন্বিত পদ্ধতি দেখা যায়:

১. প্রথম ধাপ: মৃত্যু পথযাত্রী ব্যক্তি তার ইচ্ছা অনুযায়ী একটি উইল লিখবেন, যাতে তিনি তার পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের মধ্যে তার সকল সম্পদ বা সম্পদের একটি অংশ ন্যায়সঙ্গতভাবে বণ্টন করে যাবেন।

২. দ্বিতীয় ধাপ: ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সম্পদ থেকে তার ঋণগুলো পরিশোধ করা হবে।

৩. তৃতীয় ধাপ: উইল কার্যকর ও ঋণ পরিশোধ হওয়ার পর ব্যক্তির অবশিষ্ট সম্পদ (যদি থাকে), কুরআনে বর্ণিত নির্দিষ্ট অনুপাতে (পুত্র কন্যার দ্বিগুণ পাবে, ইত্যাদি) বণ্টন করতে হবে।

অর্থাৎ, যদি কোন ব্যক্তি উইল রচনা করার পূর্বেই মারা যান, অথবা তার সম্পদের কোন অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে বা ভুলক্রমে উইলের অন্তর্ভুক্ত না করে যান, কেবল তখনই ওই সম্পদগুলো (যেগুলো উইলের বাইরে রয়ে গেছে) সেগুলোর ওপর কুরআনে বর্ণিত উত্তরাধিকারের অনুপাতগুলো কার্যকর হবে। আর যেটি স্বাভাবিক অবস্থা, অর্থাৎ, যখন একজন ব্যক্তি আল্লাহর দেওয়া বাধ্যতামূলক বিধান হিসেবে উইল রচনা করে যান, তখন সবার আগে তার উইলটিই কার্যকর হবে। আল্লাহ ভালো জানেন যে পরিবারের সকল সদস্যের আর্থিক অবস্থা ও প্রয়োজন এক নয়, তাই তিনি উইলের মাধ্যমেই এই ব্যবধান মিটানোর ব্যবস্থা রেখে দিয়েছেন।

প্রশ্ন হলো, তাহলে কেন শরিয়া আদালতগুলো মৃত ব্যক্তিদের উইল বাতিল করে শুধুমাত্র ৪:১১-১২ আয়াতগুলোতে বর্ণিত নির্দিষ্ট অনুপাতগুলোই প্রয়োগ করে?

এর মূল কারণ হলো, অধিকাংশ মুসলিম দেশে প্রচলিত শরিয়া আইন কুরআনের পরিবর্তে হাদিস ও ফতোয়ার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে বলা হয় যে, নবী (সা.) কোনো ব্যক্তিকে তার সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি উইল করে যেতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু কুরআনের কোথাও এমন নিয়মের কোনো ভিত্তি নেই।

এখানে আমরা দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করব:

প্রথমত: নবী মুহাম্মদ-এর কর্তব্য ছিল শুধুমাত্র কুরআন পৌঁছে দেওয়া এবং তার অনুসরণ করা। আল্লাহ তাঁকে নিজ থেকে নতুন কোন আইন প্রণয়নের অধিকার দেননি। কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:

“বলো, ‘আমি রাসুলদের মধ্যে নতুন নই। আমি জানি না আমার সাথে কী করা হবে আর তোমাদের সাথেই বা কী করা হবে। আমার প্রতি যা ওহী করা হয়, আমি কেবল তারই অনুসরণ করি। আমি তো একজন স্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র।’”—(৪৬:৯)

দ্বিতীয়ত: যারা দ্বীনের ব্যাপারে নতুন আইন তৈরি করে, তাদেরকে আল্লাহ কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন:

“তাদের কি এমন কতগুলো শরীক আছে, যারা তাদের জন্য দ্বীনের এমন বিধান দিয়েছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি? আর ফায়সালার ঘোষণা না থাকলে তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েই যেত। আর নিশ্চয়ই যালিমদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব।”—(৪২:২১)

আয়াতে ব্যবহৃত “শরীক” শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা আল্লাহর অনুমতি ছাড়া দ্বীনের মধ্যে নতুন আইন প্রণয়ন করে, তারা আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করে—যেটি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ (৪:৪৮)।

পোস্টের শুরুতে উল্লিখিত ঘটনায় শরিয়া আদালতের দেওয়া সেই রায়টি ছিল কুরআনের আইনের পরিপন্থী। কুরআনে বলা হয়েছে:

  • মৃত্যুর পূর্বে উইল লিখে যাওয়া বাধ্যতামূলক (২:১৮০)।
  • মৃত্যুর পর সবার আগে মৃত ব্যক্তির উইল বাস্তবায়ন ও ঋণ পরিশোধ করতে হবে (৪:১১-১২)।
  • কাকে সম্পদের কতটুকু অংশ উইল করে যেতে হবে তা কুরআনে নির্ধারিত করে দেওয়া হয়নি, বরং তা উইলকারী ব্যক্তির বিবেচনায় যেভাবে “ন্যায়সঙ্গত” হয় সেভাবে করে যেতে বলা হয়েছে।
  • উইলকারী ব্যক্তি যদি সম্পদ বন্টনে কোনো ভুল বা অন্যায় করে, তবে সে ক্ষেত্রে ন্যায়সঙ্গতভাবে তা সমাধান করার সুযোগ রয়েছে (২:১৮২)।

আল্লাহর আইন পরিপূর্ণ এবং সকল যুগের জন্য কার্যকর। তিনি কুরআনে উত্তরাধিকার বন্টনের একটি মৌলিক কাঠামো দিয়েছেন (যেটি কার্যকর হয় মৃতের উইল বাস্তবায়ন ও ঋণ পরিশোধের পর)। কিন্তু, মৃত্যুর পূর্বেই আল্লাহ প্রত্যেক ব্যক্তিকে বাধ্যতামূলকভাবে তার পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজন অনুযায়ী ন্যায়সঙ্গতভাবে উইল রচনা করে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।