কুরআনের দৃষ্টিতে ‘লাইল’ বা রাত কখন শুরু হয়-এ প্রশ্নটি নিয়ে অনেকের মধ্যেই কনফিউশন দেখা যায়। বিশেষ করে রমজান মাস এলে লাইল এর সংজ্ঞা নিয়ে প্রায়শই মতবিরোধ হতে দেখা যায়। আল্লাহ তা’আলা কুরআনে রোজার নির্দেশ দিয়েছেন এভাবে:
[২:১৮৭] তোমরা খাও এবং পান করো যতক্ষণ না তোমাদের কাছে ভোরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়, অতঃপর রোজা পূর্ণ করো লাইল পর্যন্ত।
এ আয়াত থেকে স্পষ্ট যে, রোজা ভোরের সাদা রেখা প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত খাওয়া-পান করা যায়, আর তারপর রোজা চালিয়ে যেতে হবে ‘লাইল’ পর্যন্ত। কিন্তু লাইল বা রাত ঠিক কখন শুরু হয়?
এ বিষয়ে দুটি মত প্রচলিত আছে:
১. রাত শুরু হয় সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে এবং শেষ হয় সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে।
২. রাত শুরু হয় সূর্যাস্তের পর আকাশ থেকে সমস্ত আলো পুরোপুরি মিলিয়ে গেলে (প্রায় দেড় ঘণ্টা পর) এবং শেষ হয় সূর্যোদয়ের আগে প্রথম আলোকরেখা প্রকাশিত হওয়ার আগে।
কোনটি সঠিক? যেহেতু আল্লাহ তা’আলা কুরআনকেই সবকিছুর ব্যাখ্যারূপে হিসেবে নাযিল করেছেন:
এবং আমি তোমার প্রতি এ কিতাব নাযিল করেছি সবকিছুর ব্যাখ্যাস্বরূপ… (১৬:৮৯)
তাই এ প্রশ্নের উত্তর আমরা কুরআন ছাড়া অন্য কোথাও খুঁজব না। কুরআনের আয়াতগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, রাত শুরু হয় সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে এবং শেষ হয় সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে। এর পক্ষে কুরআনে একাধিক সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।
প্রথম প্রমাণ
আল্লাহ বলেন:
[৩৯:৫] তিনি রাতকে দিনের উপর গড়িয়ে দেন এবং দিনকে রাতের উপর গড়িয়ে দেন।
এ আয়াতে ‘গড়িয়ে দেওয়া’ (ইউকাউয়ির) শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সূর্যাস্তের ঠিক আগে ও পরে আলো-অন্ধকার মিশ্রিত থাকে। সূর্যাস্তের আগে অন্ধকার ধীরে ধীরে আবির্ভূত হয়—এটিই দিনের উপর রাতের গড়িয়ে যাওয়া। আর সূর্যাস্তের পরে (যা রাতের অংশ) দিগন্তের ক্ষীণ আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়—এটি রাত থেকে দিনের বেরিয়ে যাওয়া।
যদি রাত শুরু হয় পুরোপুরি অন্ধকার হওয়ার পর, তাহলে দিন কখনোই রাতের উপর গড়িয়ে যেতে পারত না। কিন্তু আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে দিন রাতের উপর গড়িয়ে যায়—অর্থাৎ রাতের কিছু অংশে আলো থাকে। এটি শুধু সূর্যাস্তের পরে এবং সূর্যোদয়ের আগের সময়েই সম্ভব।
দ্বিতীয় প্রমাণ
আল্লাহ আরও বলেন:
[২২:৬১] এটা এজন্য যে, আল্লাহ রাতকে দিনের মধ্যে প্রবেশ করান এবং দিনকে রাতের মধ্যে প্রবেশ করান…
একই কথা আরও দু’টি আয়াতে এসেছে (৩১:২৯, ৩৫:১৩)। ‘প্রবেশ করানো’ (ইউলিজু) শব্দটি নিশ্চিত করে যে রাতের কিছু অংশে আলো থাকে এবং দিনের কিছু অংশে অন্ধকার থাকে। পুরোপুরি অন্ধকার হওয়ার পর রাত শুরু হলে কখনোই দিন ও রাতের মিশ্রণের কথা বলা হতো না।
সুতরাং, গোধূলি (শাফাক্ব) বা সন্ধ্যা (ঈশা) – এগুলো রাতেরই অংশ।
তৃতীয় প্রমাণ
[৩৬:৩৭] এবং তাদের জন্য একটি নিদর্শন হলো রাত; আমি তা থেকে দিনকে ছাড়িয়ে নিই (নাসলাখু), ফলে তারা অন্ধকারে থেকে যায়।
নাসলাখু অর্থ হলো ধীরে ধীরে খোসা ছাড়ানো। সূর্যাস্তের পরে আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাওয়াকে আল্লাহ রাত থেকে দিনকে ছাড়িয়ে নেওয়া বলেছেন। অর্থাৎ সূর্যাস্তের পরের সময়টিই রাত। যদি রাত শুরু হতো পুরো অন্ধকার হওয়ার পর, তাহলে সেই রাত থেকে আর কোনো আলো ছাড়ানোর প্রশ্নই উঠত না।
চতুর্থ প্রমাণ
[১১:১১৪] এবং তুমি সালাত কায়েম করো দিনের দুই প্রান্তে এবং রাতের নিকটবর্তী অংশসমূহে।
‘দিনের দুই প্রান্ত’ (তারাফায়িন-নাহার) বলতে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত—এ দুটি নির্দিষ্ট মুহূর্তকেই বোঝায়। এ দুটি মুহূর্ত দিনের শুরু ও শেষ। সুতরাং রাতের শুরু ও শেষও এ দুটি মুহূর্ত।
একই আয়াতে ‘রাতের নিকটবর্তী অংশসমূহ’ (যুলাফান মিন আল-লাইল) বলা হয়েছে। এ অংশগুলো দিনের দুই প্রান্তের কাছাকাছি—অর্থাৎ সূর্যাস্তের পরে এবং সূর্যোদয়ের আগে। এ সময়গুলোতে আলো থাকে, তবু কুরআন এগুলোকে রাতের অংশ বলেছে।
পঞ্চম ও চূড়ান্ত প্রমাণ
সূরা আশ-শামসের শুরুর আয়াতগুলো এ বিষয়টি চূড়ান্তভাবে স্পষ্ট করেছে:
[৯১:১-৪] শপথ সূর্যের ও তার উজ্জ্বলতার, এবং চাঁদের যখন সে তার অনুগামী হয়, এবং দিনের যখন তা (সূর্যকে) প্রকাশ করে, এবং রাতের যখন তা (সূর্যকে) আবৃত করে।
যখন সূর্য প্রকাশিত—তখন দিন। যখন সূর্য আবৃত—তখন রাত। সূর্যাস্তের পরে এবং সূর্যোদয়ের আগে সূর্য দেখা যায় না—তাই এ দুটি সময়ই রাতের অংশ। এ সংজ্ঞা পুরোপুরি নিরঙ্কুশ এবং অকাট্য।
কুরআনের প্রাসঙ্গিক আয়াতগুলো এটাই প্রমাণ করে যে, লাইল বা রাত শুরু হয় সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে এবং শেষ হয় সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে। অর্থাৎ, সূর্য থাকলে দিন, আর সূর্য না থাকলে রাত (সূর্যের আলো দেখা গেলো কি গেলো না সেটা ধর্তব্য নয়)।
