মৌমাছির ফল থেকে আহার করা

সাধারণতভাবে আমরা জানি যে, মৌমাছি বিভিন্ন ফুল থেকে মধু বা নেক্টার এবং পরাগরেণু সংগ্রহ করে। কিন্তু কুরআনের সূরা আন-নাহল-এ এই ব্যাপারে এমন কিছু বলা হয়েছে, যা আপাতদৃষ্টিতে কারও কারও কাছে ভুল তথ্য বলে মনে হতে পারে।

[১৬:৬৮] “আর তোমার পালনকর্তা মৌমাছিকে প্রত্যাদেশ দিয়েছেন: ‘পাহাড়ে, গাছে এবং মানুষ যে গৃহ নির্মাণ করে, তাতে নিজেদের বাসস্থান তৈরি করো।”

[১৬:৬৯] “তারপর সব ধরনের ফল থেকে আহার করো এবং তোমার পালনকর্তার সহজ পথগুলোতে চলো।’ তাদের উদর থেকে বের হয় বিভিন্ন রঙের পানীয়, যাতে মানুষের জন্য রয়েছে আরোগ্য। নিশ্চয়ই এর মধ্যে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।”

কুরআনের সমালোচকরা ১৬:৬৯ আয়াতটিকে একটি ‘বৈজ্ঞানিক ভুল’ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করেন, কারণ সেখানে মৌমাছিকে ‘ফুল’-এর বদলে ‘ফল’ থেকে আহার করতে বলা হয়েছে। আমরা উদ্ভিদবিজ্ঞান এবং ভাষাগত দিক থেকে এই আয়াতটির বিশ্লেষণ করে দেখব, আসলেই কি এ আয়াতে কোনো ভুল আছে, নাকি এটি কুরআনের নিখুঁত বিজ্ঞানময়তার আরও একটি প্রমাণ।

সমালোচকরা দাবি করেন, মৌমাছি ফুল থেকে আহার করে, ফল থেকে নয়। কিন্তু উদ্ভিদবিজ্ঞানের প্রাথমিক ধারণা থেকে আমরা জানতে পারি যে, ফুল এবং ফল মূলত একই জিনিসের বিকাশের দুটি ভিন্ন পর্যায় মাত্র। ফুল হলো পরাগরেণু ছড়ানোর পর্যায়, আর ফল হলো বীজ ছড়ানোর পর্যায়।

প্রতিটি ফলেরই সূচনা হয় একটি ফুল থেকে। এরপর পর্যায়ক্রমে চারটি ঘটনা ঘটে:

  • পরাগায়ন (Pollination)
  • নিষেক (Fertilization)
  • বৃদ্ধি ও বিকাশ (Growth and development)
  • ফলের পরিপক্বতা (Ripening)

মৌমাছিরা যে শুধু ফুল থেকেই খাবার গ্রহণ করে তা নয়, তারা সরাসরি পরিপক্ব ফল থেকেও আহার করে। সুতরাং, মহান আল্লাহর “ফল” শব্দটি বেছে নেওয়াটা অনেক বেশি নির্ভুল ও বিজ্ঞানসম্মত। কারণ, ‘ফল’ শব্দটি বললে তা ফুল হওয়া থেকে শুরু করে ফল পাকা পর্যন্ত সবগুলো পর্যায়কেই অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু আল্লাহ যদি শুধু “ফুল” বলতেন, তবে তা ফুলের পরবর্তী পর্যায়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করত না।

উপরের তথ্যের পাশাপাশি আয়াত দুটিতে আরও একটি বৈজ্ঞানিক আশ্চর্য লুকিয়ে আছে।

আয়াতে ব্যবহৃত আরবি শব্দগুলো লক্ষ্য করুন:

  • ‘কুলি’ (আহার করো)
  • ‘ইসলুকি’ (অনুসরণ করো)
  • ‘বুতুনিহা’ (তাদের উদর)

আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী এই প্রতিটি শব্দই স্ত্রীবাচক (Feminine gender) রূপে বিদ্যমান রয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের জানায় যে, কেবল স্ত্রী মৌমাছিরাই মধু উৎপাদন করে। তারা নেক্টার সংগ্রহ করে তা তাদের ‘হানি-স্টোমাক’ এ জমা রাখে, যা তাদের সাধারণ খাবার হজমের পাকস্থলী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এরপর চাকে ফিরে আসার পর সেই নেক্টার মধুতে পরিণত করে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় পুরুষ মৌমাছির কোনো ভূমিকা নেই, যা কুরআন ১৪শ বছর আগেই স্ত্রীবাচক শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে স্পষ্ট করে দিয়েছে।

আয়াতে ব্যবহৃত “সব ধরনের ফল থেকে আহার করো” কথাটির মাধ্যমে কুরআনের সূক্ষ্মতা ও নির্ভুলতার আরো একটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।

আমরা জানি যে, মৌমাছিরা ফুল থেকে নেক্টার সংগ্রহ (collect) করে, এবং পরবর্তীতে সেই নেক্টার থেকে চাকে মধু উৎপাদন করে। কিন্তু যেহেতু আয়াতে “আহার করো” (eat) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, তাই এর সাথে সবচেয়ে সঠিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ শব্দ হলো “ফল”। কারণ মৌমাছিরা ফলের রস সরাসরি আহার করে থাকে।

Image source: quran-islam.org