বারযাখে কি শাস্তি দেওয়া হয়?

কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, বারযাখ মূলত একটি সময়হীন, ঘুমন্ত বা সুপ্ত অবস্থা (Dormant state)। এখানে মানুষের আত্মার কোনো সময়ের অনুভূতি থাকে না। মৃত্যু থেকে শেষ বিচার পর্যন্ত হাজার হাজার বছর পার হয়ে গেলেও মানুষের কাছে তা মনে হবে মুহূর্তকালের মতো। বিচার দিবসে যখন মানুষকে পুনরুত্থিত করা হবে, তখন তাদের বিস্ময়কর প্রতিক্রিয়া কুরআনে স্পষ্ট করা হয়েছে:

[৩৬:৫১-৫২] “আর যখন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, তৎক্ষণাত তারা কবর থেকে বের হয়ে তাদের রবের দিকে ছুটে আসবে। তারা বলবে, ‘হায় দুর্ভোগ আমাদের, কে আমাদেরকে আমাদের নিদ্রাস্থল থেকে উঠালো?’ সর্বশক্তিমান আল্লাহ তো এরই ওয়াদা করেছিলেন এবং রাসূলগণ সত্যই বলেছিলেন।”

যদি তারা কবরে বা বারযাখে প্রতিনিয়ত শাস্তিই ভোগ করত, তবে তারা সেটিকে ‘নিদ্রাস্থল’ বা বিশ্রামের জায়গা বলত না। এছাড়াও চূড়ান্ত বিচার বা ফয়সালার আগেই কাউকে শাস্তি দেওয়াটা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

কুরআনে ফেরেশতাদের সাথে পাপীদের যে কথোপকথন, আঘাত বা ভর্ৎসনার কথা বলা হয়েছে, তা কবরের ভেতরে কোনো জিজ্ঞাসাবাদের দৃশ্য নয়। আয়াতগুলোর প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ঘটনাগুলো ঘটে ঠিক মৃত্যুর মুহূর্তে বা জান কবজের সময়।

[৮:৫০] “আর যদি তুমি দেখতে, যখন ফেরেশতারা কাফিরদের জান কবজ করে! তারা তাদের মুখে ও পিঠে আঘাত করতে থাকে এবং (বলে), ‘তোমরা জ্বলন্ত আগুনের স্বাদ আস্বাদন করো!’”

[২৩:৯৯-১০০] “অবশেষে যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু আসে, তখন সে বলে, ‘হে আমার রব! আমাকে আবার ফেরত পাঠান,’ ‘যাতে আমি যা ছেড়ে এসেছি তাতে সৎকাজ করতে পারি।’ কখনোই নয়! এটি তো তার একটি মুখের কথা মাত্র। আর তাদের সামনে রয়েছে ‘বারযাখ’ পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত।”

সূরা আনফালের ৫০ নম্বর আয়াতে মুখে ও পিঠে আঘাত করার যে কথা বলা হয়েছে, তা মূলত পাপীদের ‘জান কবজ করার মুহূর্তের’ (Pangs of death) একটি যন্ত্রণাদায়ক দৃশ্য। এটি কবরের ভেতরের কোনো শাস্তি নয়, বরং আত্মা বের করে আনার মুহূর্তের ঘটনা।

মৃত্যুর সময় প্রতিটি মানুষ সত্যটি উপলব্ধি করতে পারে এবং তার চূড়ান্ত গন্তব্য সম্পর্কে জানতে পারে। ফেরেশতারা জান কবজ করার সময় পাপীদেরকে তাদের সুনিশ্চিত পরিণতির (জাহান্নাম) কথা জানিয়ে দেন। বারযাখে মানুষের কোনো সময়ের অনুভূতি থাকে না। তাই মৃত্যুর সময় ফেরেশতাদের এই ঘোষণা শোনার পর পাপীরা যখন শেষ বিচারের দিন জাগ্রত হবে, তখন তাদের কাছে মনে হবে যেন মাঝখানে মাত্র এক ঘণ্টা বা মুহূর্তকাল পার হয়েছে। ফলে ফেরেশতাদের বলা শাস্তির প্রতিশ্রুতি তাদের কাছে তাৎক্ষণিক বলেই মনে হবে।

একইভাবে, পুণ্যবানদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর সময় ফেরেশতারা সুসংবাদ নিয়ে আসেন। কুরআনে এমন কিছু আয়াত রয়েছে, যা পড়লে মনে হতে পারে পুণ্যবানরা মৃত্যুর পরপরই জান্নাতে চলে গেছেন:

[৩৬:২৬-২৭] “তাকে বলা হলো, ‘জান্নাতে প্রবেশ করো।’ সে বলল, ‘হায়! আমার সম্প্রদায় যদি জানত—কীভাবে আমার রব আমাকে ক্ষমা করেছেন এবং আমাকে সম্মানিত করেছেন।’”

[৩:১৬৯] “আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদেরকে মৃত ভেবো না। বরং তারা জীবিত এবং তাদের রবের কাছে রিযিকপ্রাপ্ত।”

এর অর্থ এই নয় যে পুণ্যবান আত্মারা ‘বারযাখ’-এর সুপ্তাবস্থাকে পাশ কাটিয়ে (skip করে) সরাসরি জান্নাতে চলে গেছেন। বরং মৃত্যুর সময় ফেরেশতাদের মাধ্যমে তাদের জান্নাতের সুনিশ্চিত সুসংবাদ দেওয়া হয়। আল্লাহর কাছে যেহেতু সময় ও কালের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই, এবং বারযাখে যেহেতু সময়ের কোনো অস্তিত্ব নেই, তাই মৃত্যুর পরপরই যখন শেষ বিচারের দিন তারা জাগ্রত হবে, তখন তাদের কাছে মনে হবে যেন জান্নাতের ওই সুসংবাদটি তারা মাত্রই পেয়েছে।

মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে আরেকটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো— ভালো মানুষের আত্মারা বারযাখে ‘ইল্লিয়্যিন’-এ এবং খারাপ মানুষের আত্মারা ‘সিজ্জিন’-এ অবস্থান করে। কিন্তু কুরআন সুস্পষ্টভাবে এই ধারণাকে খণ্ডন করে। কুরআনের মতে, এগুলো কোনো আত্মার রিফিউজি ক্যাম্প বা থাকার জায়গা নয়; বরং এগুলো হলো মানুষের কৃতকর্মের রেকর্ড বুক বা আমলনামা।

[৮৩:৭-৯] “কখনোই নয়! নিশ্চয়ই পাপাচারীদের আমলনামা ‘সিজ্জিন’-এ রয়েছে। আর তুমি কি জানো ‘সিজ্জিন’ কী? এটি একটি লিপিবদ্ধ খাতা (registry book)।”

[৮৩:১৮-২০] “কখনোই নয়! নিশ্চয়ই পুণ্যবানদের আমলনামা ‘ইল্লিয়্যিন’-এ রয়েছে। আর তুমি কি জানো ‘ইল্লিয়্যিন’ কী? এটি একটি লিপিবদ্ধ খাতা (registry book)।”