মুসলিম সমাজে আযানকে সাধারণত একটি অপরিহার্য ধর্মীয় আচার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অনেকে মনে করেন, আযান ছাড়া বোধহয় সালাতই সম্পূর্ণ হয় না। কিন্তু কুরআনের আলোকে বিষয়টি পর্যালোচনা করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—আযান কি সত্যিই আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত কোনো বিধান, নাকি এটি পরবর্তীকালে প্রবর্তিত একটি প্রথা?
কুরআনে একমাত্র যে আয়াতে সালাতের জন্য “ডাক” বা “ঘোষণা”-র কথা উল্লেখ আছে, তা হলো সূরা জুম‘আ, আয়াত ৯:
“হে মুমিনগণ! জুম‘আর দিনে যখন সালাতের জন্য ডাক দেওয়া হয় (নুদিয়া লিস্সালাত), তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও…” (৬২:৯)
এই আয়াতে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এখানে “ডাক দেওয়া” বা “ঘোষণা করা”-র কথা বলা হয়েছে; কিন্তু কীভাবে, কী ভাষায়, কার কণ্ঠে, কিংবা নির্দিষ্ট কী শব্দ ব্যবহার করে এই ডাক দিতে হবে—সে বিষয়ে কুরআন সম্পূর্ণ নীরব। কুরআনের ভাষা থেকে বোঝা যায় যে, সালাতের সময় হয়েছে—এ তথ্য মানুষকে জানানোই ছিল এই ঘোষণার একমাত্র উদ্দেশ্য।
কুরআন নাযিলের যুগে এখনকার মতো কোনো আধুনিক প্রযুক্তি ছিল না। তখন মানুষের কণ্ঠই ছিল সময় জানানোর প্রধান মাধ্যম। ফলে তখন স্বাভাবিকভাবেই উচ্চস্বরে ঘোষণা দেওয়া হতো। কিন্তু এটিকে কোনো নির্দিষ্ট আচার বা বাধ্যতামূলক ধর্মীয় রীতিতে পরিণত করার কোনো নির্দেশ কুরআনে নেই।
বর্তমান যুগে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঘড়ি, ক্যালেন্ডার, অনলাইন সালাত-চার্ট, মোবাইল অ্যাপ, এসএমএস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রেডিও, টিভি—অসংখ্য উপায়ে মানুষ সালাতের সময় সম্পর্কে অবগত হতে পারে। এভাবে সালাতের সময় জানানোর উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে যাচ্ছে বহু বিকল্প পদ্ধতিতে। তাহলে কুরআনের দৃষ্টিতে সালাতের সময় জানানোর জন্য নির্দিষ্ট একটি পদ্ধতিকে বাধ্যতামূলক করার কোনো যৌক্তিকতা থাকে কি?
কুরআনের কোথাও বলা হয়নি যে সালাতের ঘোষণা অবশ্যই মানবকণ্ঠে দিতে হবে, কিংবা নির্দিষ্ট কিছু বাক্য আরবি ভাষায় উচ্চারণ করতেই হবে। “আযান” নামে পরিচিত বর্তমান নির্ধারিত বাক্যসমূহ কুরআনে কোথাও নেই। বরং কুরআনের নীরবতাই প্রমাণ করে—আযান নিজে কোনো ইবাদত বা স্বতন্ত্র বিধান হিসেবে আল্লাহ নির্ধারণ করেননি।
এরপরও যখন আযানকে ফরজ বা আবশ্যিক আচার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—এই বিধান কে দিল? আল্লাহ না মানুষ? কুরআন এ ধরনের বিষয়ে স্পষ্ট সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে:
“নাকি তাদের এমন কতগুলো শরিক আছে, যারা তাদের জন্য দ্বীনের এমন বিধান প্রণয়ন করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি?” (৪২:২১)
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—আল্লাহর অনুমতি ছাড়া দ্বীনের মধ্যে কোনো কিছু বাধ্যতামূলক করা মানেই আল্লাহর কর্তৃত্বে অংশীদার স্থাপন করা।
সুতরাং কুরআনের আলোকে বলা যায়, সালাতের জন্য ঘোষণা দেওয়া একটি প্রয়োজনীয় কাজ—কিন্তু সেটি কোনো নির্দিষ্ট রীতিতে, নির্দিষ্ট শব্দে, নির্দিষ্ট সুরে করতে হবে—এমন কোনো নির্দেশ আল্লাহ দেননি। আযানকে একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রথা হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু একে আল্লাহ প্রদত্ত বাধ্যতামূলক বিধান হিসেবে উপস্থাপন করা কুরআনসম্মত নয়।