আব্রাহামিক ধর্মগুলোতে বহুল আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হলো আদম ও তার স্ত্রীর জান্নাত থেকে নির্বাসিত হওয়ার ঘটনা। অধিকাংশ মানুষের ধারণা হলো পরকালে বিশ্বাসী ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিগণ যে জান্নাতে যাবে – আদম ও তার স্ত্রী সেই জান্নাতেই ছিলেন।
তবে কুরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলো বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয় যে আদম ও তার স্ত্রী ভিন্ন কোন জগতে ছিলেন না, বরং তারা পৃথিবীতে তৈরি একটি জান্নাতের মধ্যেই ছিলেন।
১. জান্নাত শব্দের অর্থ
আরবি শব্দ জান্নাত (جَنَّة) গঠিত হয়েছে মূল ধাতু জিম-নুন-নুন (ج-ن-ن) থেকে, যার অর্থ আবৃত করা, আচ্ছাদিত করা, লুকানো ইত্যাদি। একই মূল থেকে জ্বিন শব্দটিও এসেছে, কারণ জ্বিন হলো এমন এক জাতি যারা মানুষের নিকট অদৃশ্য।
জান্নাত শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো বাগান বা উদ্যান। আরবি অভিধান অনুযায়ী, জান্নাত বলতে এমন জমিকে বোঝায় যেখানে ঘন গাছপালা মাটিকে আবৃত করে রাখে। জান্নাত শব্দটি পরকালীন স্বর্গ বোঝাতে ব্যবহৃত হলেও, এর মৌলিক অর্থ হলো বাগান বা উদ্যান, যা পৃথিবীতেও হতে পারে আবার পরকালেও হতে পারে।
২. আদম-কে পৃথিবীর জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছিল
কুরআনের স্পষ্ট বর্ণনা অনুযায়ী, আদমকে পৃথিবীতে খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে প্রেরণের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছিল। সূরা বাকারার ৩০ নম্বর আয়াতে এ কথা সুস্পষ্ট:
[২:৩০] “আর স্মরণ কর, যখন তোমার রব ফেরেশতাদেরকে বললেন, ‘নিশ্চয় আমি যমীনে একজন খলিফা (প্রতিনিধি) সৃষ্টি করছি’, তারা বলল, ‘আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে তাতে বিপর্যয় ঘটাবে এবং রক্তপাত করবে? অথচ আমরাই তো আপনার প্রশংসাসহ তাসবীহ পাঠ করি এবং আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করি’। তিনি বললেন, ‘নিশ্চয় আমি যা জানি, তোমরা তা জান না’।”
এই আয়াতে আদমের সৃষ্টির উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব। এখানে কোনো ভিন্ন জগতের আবাস বা জান্নাতে আদমকে রাখার কথা বলা হয়নি। এর মাত্র কয়েকটি আয়াত পরেই ২:৩৫ আয়াতে আদমের সেই জান্নাতের উল্লেখ এসেছে, এবং কুরআনের বর্ণনার ধারাবাহিকতায় এই সময়ের মধ্যে আদম ও তার স্ত্রীর অবস্থানের পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত নেই।
[২:৩৫] “আর আমি বললাম, ‘হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করো এবং তা থেকে আহার করো স্বাচ্ছন্দ্যে, তোমাদের ইচ্ছানুযায়ী। কিন্তু এই গাছটির নিকটবর্তী হয়ো না, তাহলে তোমরা যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে’।“
৩. পরকালীন জান্নাত এখনো সৃষ্টি করা হয়নি
কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন মহাবিশ্বকে পুনরায় সৃষ্টি করা হবে এবং সেই নতুন সৃষ্টিতেই চূড়ান্ত জান্নাত ও জাহান্নাম প্রতিষ্ঠিত হবে।
[২১:১০৪] “সেদিন আমি আসমানসমূহকে গুটিয়ে নেব, যেভাবে গুটানো হয় লিখিত দফতর; যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম, সেভাবেই তা পুনরায় সৃষ্টি করব। এটি আমার ওয়াদা, আর আমি তা পালন করবই।”
[২১:১০৫] “আর আমি তো যাবূরে উপদেশের পর লিখে দিয়েছি যে, ‘নিশ্চয় আমার নেককার বান্দারাই এই যমীনের উত্তরাধিকারী হবে’।”
[১৪:৪৮] “যেদিন পরিবর্তন করা হবে এই যমীনকে অন্য যমীনে এবং আসমানসমূহকেও; এবং সবাই উপস্থিত হবে এক, প্রবল পরাক্রমশালী আল্লাহর সামনে।”
এই আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, পৃথিবী ও আসমানসমূহ কিয়ামতের দিন নতুন করে সৃষ্টি করা হবে এবং এই নতুন সৃষ্টিতেই জান্নাত প্রতিষ্ঠিত হবে। আদমকে সৃষ্টির সময় থেকেই যদি সেই জান্নাতের অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকতো তাহলে কিয়ামতের পর পুনরায় তা সৃষ্টির প্রয়োজন হবে কেন?
৪. সূর্যের তাপের উল্লেখ
সূরা ত্ব-হার একটি আয়াতে সেই বিশেষ জান্নাতে সূর্যের তাপের কথা বলা হয়েছে:
[২০:১১৭-১১৯] “অতঃপর আমি বললাম, ‘হে আদম, নিশ্চয় এ (শয়তান) তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু; সুতরাং সে যেন কিছুতেই তোমাদেরকে জান্নাত থেকে বের করে না দেয়, দিলে তোমরা কষ্ট পাবে। নিশ্চয় তোমার জন্য এই সুযোগ রইল যে, তুমি জান্নাতে ক্ষুধার্তও হবে না এবং বস্ত্রহীনও হবে না। আর তুমি সেখানে পিপাসার্তও হবে না এবং রৌদ্রক্লিষ্টও হবে না’।“
আলোচ্য আয়াতে বলা হয়েছে যে, আদম জান্নাতে সূর্যের তাপে কষ্ট পাবেন না। উক্ত আয়াতে সূর্যের তাপের উল্লেখ প্রমাণ করে যে, সেই জান্নাত এমন একটি স্থানে ছিল যেখানে সূর্যের অস্তিত্ব রয়েছে। যদি আদম সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি জগতে (পরকালীন জান্নাতে) থাকতেন, যেখানে সূর্যের অস্তিত্বই নেই সেখানে সূর্যের তাপের কথা উল্লেখ করা অর্থহীন হতো।
সুতরাং বলা যায়, আদম ও তার স্ত্রী পৃথিবীরই একটি বাগানে ছিলেন যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছাতো, কিন্তু আদম ও তার স্ত্রী সেই তাপে কষ্ট পাননি—এটি ছিল তাদের জন্য এক বিশেষ সুবিধা। কিন্তু তারা যখন জান্নাত থেকে বের হয়ে গেলেন, তখন তাপ, ক্ষুধা, পিপাসা ইত্যাদি অনুভব করতে শুরু করলেন।
৫. ‘নেমে যাওয়া’ (ইহবিতু) শব্দের প্রকৃত অর্থ
[২:৩৬] “অতঃপর শয়তান তাদেরকে সেখান থেকে বিচ্যুত করল। অতঃপর তারা যে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ছিল, তা থেকে তাদেরকে বের করে দিল। আর আমি বললাম, ‘তোমরা নেমে যাও (ইহবিতু), তোমরা একে অপরের শত্রু। আর তোমাদের জন্য যমীনে রয়েছে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আবাস ও ভোগ-উপকরণ’।”
অনেকে মনে করেন, এই আয়াতে “তোমরা নেমে যাও” (ইহবিতু) শব্দটি প্রমাণ করে যে আদম জান্নাত থেকে পৃথিবীতে নেমে এসেছিলেন। কিন্তু কুরআনে এই শব্দটি নিচের দিকে নামা ছাড়াও অন্য অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
[২:৬১] (অংশ) “তোমরা কোন নগরে নেমে যাও (ইহবিতু মিসরা)…”
এখানে বনী ইস্রাঈলকে ‘কোন এক নগরে নেমে যাওয়া’র নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অথচ তারা ইতিমধ্যেই পৃথিবীতে ছিলো। তাই এখানে ‘নেমে যাওয়া’ বলতে নিচের দিকে যাওয়া নয়, বরং এক ভূখন্ড থেকে আরেক ভূখন্ডে যাওয়া-কে বোঝানো হয়েছে।
‘ইহবিতু’ শব্দটি ‘হাবাতা’ মূল থেকে এসেছে যার অর্থ হলো এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় অবতরণ করা, মর্যাদায় নিচে নেমে যাওয়া বা শর্তের পরিবর্তন হওয়া ইত্যাদি। সুতরাং ৭:২৪ আয়াতের “ইহবিতু” বলতে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে ভৌগোলিক অবতরণ নয়, বরং এক উত্তম অবস্থা থেকে নিম্ন অবস্থায় চলে যাওয়াকে বোঝানো হয়েছে।
সারকথা
কুরআন কখনোই বলে না যে আদম অন্য কোনো গ্রহ বা স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে এসেছেন। বরং, কুরআনের ধারাবাহিক বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, তিনি পৃথিবীতেই ছিলেন এবং পৃথিবীতেই তার পরীক্ষা হয়েছে। আদম ও তার স্ত্রী যে জান্নাতে ছিলেন তা পৃথিবীরই একটি বিশেষ উদ্যান, আর তাদের ‘অবতরণ’ ছিল সেই উদ্যানের সুখময় অবস্থা থেকে সাধারণ পৃথিবীর কষ্টকর অবস্থায় নেমে আসা। এটি ছিল আদমের জন্য একটি পরীক্ষা, এবং এই পরীক্ষার মাধ্যমেই তিনি পৃথিবীতে তার খিলাফতের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত হন।