ইমাম আবু হানিফা একজন একনিষ্ঠ আহলুল কুরআন ছিলেন।
তিনি লোকমুখে প্রচলিত হাদিসগুলোর বদলে কুরআন এবং যুক্তিকে দ্বীনের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতেন। আবু হানিফা বিশ্বাস করতেন কুরআন সৃষ্ট। তার এই মুক্তচিন্তা এবং ‘কুরআন সৃষ্ট’ মতবাদের কারণে তৎকালীন মুহাদ্দিসরা তাকে চরমভাবে ঘৃণা করতো।
নীচে ইমাম আবু হানিফা সম্পর্কে কতিপয় হাদিসবেত্তার মন্তব্য উল্লেখ করা হলো:
১. ইমাম বুখারী বর্ণনা করেন:
- ইমাম আবু হানিফা মুরজিয়া ছিল।
(তারিখ আল কাবির, ভলিউম ৮, পৃষ্ঠা ৮১)
২. ইমাম বুখারী আরো বলেন:
- যখন সুফিয়ান আস-সাওরি ইমাম আবু হানিফার মৃত্যুর সংবাদ পান তখন তিনি বলেন – সকল প্রশংসা আল্লাহর যে এমন একজন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেছে যে ধীরে ধীরে ইসলামকে ধ্বংস করে দিচ্ছিল। ইমাম আবু হানিফার চেয়ে ইসলামের জন্য বেশি ক্ষতিকর আর কেউ জন্মগ্রহণ করেনি।
(তারিখ আল সাগির)
৩. ইমাম আহমদ বিন হাম্বল বলেন:
- আমার নিকট ইমাম আবু হানিফার মত ছাগলের মলের সমতুল্য।
(তারিখ আল বাগদাদ, ভলিউম ১৫, পৃষ্ঠা ৫৬৯)
৪. সুফিয়ান আস-সাওরি বর্ণনা করেন:
- হাম্মাদ বিন আবু সুলাইমান আমাকে বলেছেন, ‘মুশরিক আবু হানিফাকে জানিয়ে দাও, তার ধর্মের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ সে বলে কুরআন সৃষ্ট।’
(খাল্ক্ব আফ’আল আল-ইবাদ, পৃষ্ঠা ২৯, ইমাম বুখারী; শারহু উসুলিল ইতিক্বাদ, ২/২৬৫, লালাকাই)
আহমেদ খান (প্রফেসর অফ ইসলামিক স্টাডিজ, কায়রো)-এর বই ‘Heresy and The Formation of Medieval Islamic Orthodoxy’-এর তথ্যানুসারে:
ইমাম আবু হানিফা – মাত্র ২ টি হাদিস গ্রহণ করেন
ইমাম মালিক – ৫২৭ টি হাদিস গ্রহণ করেন (তিনি মূলত মদীনায় প্রচলিত নিয়ম-কানুন অনুসরণ করতেন)
ইমাম শাফি’ই – ২,০০০ হাদিস গ্রহণ করেন (‘হাদিস হলো ওহী’ – এই মতবাদ প্রচার করেন)
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল – ৪০,০০০ হাদিস গ্রহণ করেন (তিনি হাদিসকে কুরআনের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিতেন)
আহমদ ইবনে হাম্বলের পর সুন্নি ইতিহাসে সবচেয়ে বড় হাদিস সংগ্রাহক ছিলেন ইবনে আবি শাইবা (৩৭,০০০ হাদিস), তিনি তার মুসান্নাফে ৪৮৫ টি পয়েন্ট এনেছেন শুধুমাত্র ইমাম আবু হানিফাকে ভুল প্রমাণ করার জন্য! যার একটিতে লেখা আছে—ইমাম আবু হানিফার নিকট যখন ব্যভিচারীকে রজম করার হাদিসটি পৌঁছায়, তখন তিনি বলেন “তাদেরকে রজম করা যাবে না”।
আহমদ ইবনে হাম্বলের ছেলে, আবু আব্দুর রহমান আব্দুল্লাহ – তার লেখা বই ‘কিতাব আস-সুন্নাহ’ তে ইমাম আবু হানিফাকে নিয়ে যেসব কথা বলেছেন, তার কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হলো:
২৩৬. ইসহাক ইবনে আব্দুর রহমান বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি প্রথম বলে ‘কুরআন মাখলুক’, সে হলো আবু হানিফা’।
৩৯২. একবার এক লোক ইবনে আল-মুবারককে একটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে, তিনি এই ব্যাপারে রাসুলের একটি হাদিস বর্ণনা করেন। তখন ওই লোক বললো: ‘আবু হানিফাতো এর বিপরীত কথা বলে’। তখন ইবনে মুবারক রাগান্বিত হয়ে বললেন: ‘আমি তোমাকে রাসুলুল্লাহর একটি হাদিস বললাম, আর তুমি এমন এক ব্যক্তির মত তুলে ধরলে যে কিনা হাদিসের বিরোধিতা করে?’
৪০১. আলী ইবনে আসিম বলেন, আমি ইমাম আবু হানিফার নিকট বিয়ের ব্যাপারে একটি হাদিস বর্ণনা করেছিলাম, তিনি বলেছিলেন ‘এই বর্ণনা শয়তান থেকে এসেছে’।
৪০৩. সাঈদ বর্ণনা করেন, একবার আমি মক্কায় আবু হানিফার সাথে বসেছিলাম। সেখানে একলোক বললো: ‘উমর ইবনে খাত্তাব এই এই কথাগুলো বলেছেন’ – তখন আবু হানিফা বললেন, ‘এগুলো শয়তানের কথা’। আরেক লোক বললো: ‘আল্লাহর রাসুল কি বলেননি, যে ব্যক্তি শিঙ্গা লাগায় আর যাকে লাগানো হয় দু’জনই তাদের সিয়াম ভেঙ্গে ফেলে?’ – তখন আবু হানিফা বললেন, ‘এটাতো একটা ছড়া’। আবু হানিফার এই কথা শুনে আমি রাগান্বিত হয়ে সেখান থেকে চলে আসি।
১০ম শতাব্দীর আগপর্যন্ত সকল সুন্নি আলেমদের মধ্যে ইজমা ছিল – ‘আবু হানিফা যিন্দিক, তার মত গ্রহণ করা যাবে না।‘ কিন্তু এরপরও আবু হানিফার মতবাদ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেতে থাকে। বড় বড় ইসলামি সম্রাজ্যগুলো শাসন কাজ পরিচালনার জন্য ইমাম আবু হানিফার মত গ্রহণ করতে থাকে। একপর্যায়ে তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জেতা অসম্ভব বুঝতে পেরে প্রোটো-সুন্নিরা তার নামে মাযহাব তৈরি করে। তার নামে ‘ফিকহুল আকবর’, ‘কিতাবুল আসার’ প্রভৃতি বই রচনা করে। এভাবে একটা সময় মানব রচিত হাদিস আর মানব রচিত ফিকাহ দ্বারা তৈরি হানাফি মাযহাবের অন্তরালে হারিয়ে যায় ইমাম আবু হানিফার প্রকৃত আদর্শ।