ইসলাম ধর্মে দৈনিক সালাত এবং রমজানের রোজা পালনের সময় নির্ধারণের প্রধান ভিত্তি হলো সূর্যের অবস্থান। ফজর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখা এবং সূর্যের গতিপথ অনুযায়ী সালাতের সময় নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোতে, যেখানে গ্রীষ্মকালে সূর্য খুব সামান্য সময়ের জন্য অস্ত যায় এবং দিন ২০-২২ ঘণ্টারও বেশি দীর্ঘ হয়, কিংবা শীতকালে সূর্য ওঠে না বললেই চলে—সেখানে বসবাসকারী মুসলিমরা কীভাবে সালাত ও সিয়াম পালন করবেন?
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন যে, এই কিতাবে সবকিছুর বিশদ ব্যাখ্যা, পথনির্দেশ এবং রহমত রয়েছে (১৬:৮৯)। তাই এরূপ ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে উদ্ভূত সমস্যার সমাধানও আমরা কোরআন থেকে খুঁজে বের করবো।
আল্লাহ তাআলা মানুষকে তার সাধের বাইরে দায়িত্ব দেন না এবং দ্বীনকে তিনি মানুষের জন্য সহজ করে দিয়েছেন:
[২২:৭৮] “তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো কঠোরতা আরোপ করেননি।”
যেসব অঞ্চলে সূর্যের গতিপ্রকৃতি অনুসরণ করা মানুষের সাধ্যের বাইরে বা অত্যন্ত কষ্টকর (যেমন: মেরু অঞ্চলের অবিরাম দিন বা রাত), সেখানে ইসলাম কড়াকড়ি না করে সহজ বিকল্প অনুসরণের সুযোগ রেখেছে।
কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা মক্কার মসজিদুল হারামকে মুসলমানদের জন্য ক্বিবলা বা ধর্মের মূল কেন্দ্র বিন্দু (Focal Point) হিসেবে নির্ধারণ করেছেন:
[২:১৪৪] “সুতরাং আমি অবশ্যই তোমাকে এমন এক কিবলার দিকে ফিরিয়ে দেব, যা তুমি পছন্দ করো। অতএব, তুমি মসজিদুল হারামের দিকে তোমার মুখ ফেরাও।“
এই নির্দেশনার আলোকে বলা যায় যে, মেরু অঞ্চলে বসবাসকারী মুসলিমদের জন্য মক্কার সময়সূচি (Mecca Time) অনুসরণ করাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত। তবে এখানে লক্ষণীয় যে, এটি কেবল গ্রীষ্মের অতি দীর্ঘ দিনেই নয়, বরং শীতকালের অতি সংক্ষিপ্ত দিনগুলোতেও (যখন দিন মাত্র কয়েক মিনিটের হতে পারে) একইভাবে প্রযোজ্য হবে।
মক্কার সময় অনুসরণ করার পেছনে দুটি শক্তিশালী যুক্তিও উপস্থাপন করা যায়:
- মক্কা হলো সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদের ক্বিবলা, হজ্জের গন্তব্য এবং দ্বীনের প্রধান কেন্দ্রস্থল। তাই স্বাভাবিক হিসাব সম্ভব না হলে এই কেন্দ্রীয় সময়কে অনুসরণ করাই সর্বাপেক্ষা যুক্তিসঙ্গত।
- যদি একই এলাকার বা দেশের মানুষ নিজেদের ইচ্ছামতো কিংবা ভিন্ন ভিন্ন দেশের সময় মেনে চলে, তবে সমাজে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। একই শহরের মানুষ ভিন্ন সময় ইফতার করবে বা নামাজ পড়বে, যা সামাজিক বিভেদ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে জুমআ ও জামাতে সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। মক্কার সময় মেনে চললে মেরু অঞ্চলের মুসলিমদের মাঝে শৃঙ্খলা ও ঐক্য বজায় থাকবে।