আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি গল্প আছে যে— ফেরাউন স্বপ্নে দেখেছিল বা গণকেরা তাকে বলেছিল যে, বনী ইসরাইলের ঘরে এমন এক পুত্র সন্তান জন্ম নেবে যে তার সাম্রাজ্য ধ্বংস করবে। আর সেই নির্দিষ্ট সন্তানকে (অর্থাৎ মূসা নবীকে) হত্যার জন্যই নাকি ফেরাউন গণহারে নবজাতক পুত্র সন্তানদের হত্যা করত।
কিন্তু সত্যটা হলো পবিত্র কুরআনের কোথাও এই কাল্পনিক ভবিষ্যদ্বাণী বা স্বপ্নের কোনো উল্লেখ নেই! বরং, কুরআন পড়লে আমরা এমন একটি অকাট্য যুক্তির সন্ধান পাই, যা এই প্রচলিত গল্পকে পুরোপুরি বাতিল করে দেয়।
১. মূল কারণ: রাজনৈতিক দমন-পীড়ন
কুরআন স্পষ্ট বলছে যে, ফেরাউন তার সমাজে নিজেকে অনেক উঁচুতে নিয়ে গিয়েছিল এবং জনগণকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করেছিল। এর একটি শ্রেণিকে (বনী ইসরাইল) দুর্বল করে রাখার জন্যই সে তাদের ছেলে শিশুদের হত্যা করত। এটি কোনো স্বপ্নের কারণে নয়, বরং এটি ছিল তাদেরকে চিরস্থায়ীভাবে দাস বানিয়ে রাখার জন্য ফেরাউনের এক জঘন্য রাষ্ট্রীয় পলিসি।
[২৮:৪] “নিশ্চয়ই ফেরাউন দেশে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেছিল এবং সেখানকার অধিবাসীদের বিভিন্ন দলে বিভক্ত করেছিল। তাদের একটি দলকে সে দুর্বল করে রেখেছিল; সে তাদের পুত্র-সন্তানদের হত্যা করত…”
২. নবুওয়াত প্রাপ্তির পরও হত্যাযজ্ঞ অব্যাহত ছিল!
মূসার জন্মের সময় ফেরাউন শিশুদের হত্যা করত, এটা সত্য। কিন্তু মূসা নবী যখন বড় হলেন, নবী হিসেবে নির্বাচিত হলেন এবং ফেরাউনের দরবারে সত্যের দাওয়াত নিয়ে গেলেন— তখন কী হলো? কুরআন বলছে, তিনি নবী হয়ে আসার পরও ফেরাউন নতুন করে পুত্র সন্তানদের হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল!
[৪০:২৫] অতঃপর সে (মূসা) যখন আমার পক্ষ থেকে তাদের কাছে সত্য নিয়ে পৌঁছাল, তখন তারা বলল: ‘যারা তার সাথে ঈমান এনেছে, তাদের পুত্র-সন্তানদের হত্যা করো এবং নারীদের জীবিত রাখো’…”
একটু সাধারণ লজিক দিয়ে ভাবুন তো: যদি ফেরাউনের উদ্দেশ্য শুধুই ‘সেই নির্দিষ্ট শিশু’ (যিনি তার সাম্রাজ্য ধ্বংস করবেন) তাকে হত্যা করা হতো, তবে মূসা যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে নবী হিসেবে তার সামনে দাঁড়ালেন, তখন কেন সে আবার নতুন করে শিশুদেরকে হত্যার নির্দেশ দিল? মূসাতো তখন আর শিশু নেই! যদি শুধু শিশু মূসাকে আটকানোই ফেরাউনের লক্ষ্য হতো, তবে মূসা আসার পর শিশু হত্যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি!
সিদ্ধান্ত:
ফেরাউন কর্তৃকপুত্র সন্তানদের হত্যা করার সাথে কোনো কাল্পনিক ভবিষ্যদ্বাণীর সম্পর্ক ছিল না। ফেরাউন মূলত ভয় পেত বনী ইসরাইলের জনবল ও শক্তি বৃদ্ধিকে। মূসা নবী আসার পর যখন বনী ইসরাইল আবার ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করল, তখন ফেরাউন তাদেরকে পুনরায় দুর্বল ও ভীত করার হাতিয়ার হিসেবে সেই পুরনো পলিসি অর্থাৎ পুত্র সন্তান হত্যার রীতি আবার চালু করল। আমাদের উচিত প্রচলিত গালগল্পের চেয়ে পবিত্র কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াত এবং যুক্তিভিত্তিক চিন্তার ওপর বেশি নির্ভর করা।