সাধারণভাবে অনেকে মুমিন ও মুসলিম শব্দ দুটিকে সমার্থক মনে করলেও, কুরআনের ভাষায় এদের ব্যবহারে কিছুটা ভিন্নতা আছে। এই লিখায় আমরা শুধু কুরআনের আলোকে এই দুটি পরিভাষার অর্থ ও পার্থক্য জানার চেষ্টা করবো।
১. ‘মুসলিম’ শব্দের কুরআনিক অর্থ
‘মুসলিম’ শব্দটি আরবি ‘ইসলাম’ মূল থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ আত্মসমর্পণ করা বা অনুগত হওয়া। কুরআনের পরিভাষায়, মুসলিম বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝায় যে একমাত্র সত্য আল্লাহর কাছে নিজের ইচ্ছাকে সমর্পণ করেছে এবং আনুগত্য প্রকাশ করে। এটি কুরআন বা শেষ নবী-র ওপর গভীর ঈমান থাকা বা না থাকা নির্বিশেষে প্রযোজ্য।
অন্য কথায়, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে, সে-ই মুসলিম। এই আত্মসমর্পণের মধ্যে আনুগত্যের প্রকাশ থাকে, তবে অন্তরে কুরআনের ওপর পূর্ণ ঈমান না-ও থাকতে পারে।
২. ‘মু’মিন’ শব্দের কুরআনিক অর্থ
‘মু’মিন’ শব্দটি ‘ঈমান’ মূল থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ গভীর বিশ্বাস, আস্থা, সত্যায়ন ইত্যাদি। কুরআনের পরিভাষায়, মু’মিন বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝায় যে আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি পূর্ণ ঈমান রাখে। নবী মুহাম্মদ-এর সময়ে মু’মিন সেই ব্যক্তিকে বলা হতো যে কুরআন ও শেষ নবীর সত্যতার ওপর দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করতো।
[২:২৮৫] “রাসূল তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা তাঁর নিকট অবতীর্ণ হয়েছে তাতে ঈমান এনেছেন এবং মুমিনগণও। তারা সকলে আল্লাহতে, তাঁর ফেরেশতাগণে, তাঁর কিতাবসমূহে এবং তাঁর রাসূলগণে ঈমান এনেছে। (তারা বলে:) ‘আমরা তাঁর রাসূলগণের মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না।’ আর তারা বলে: ‘আমরা শুনলাম ও মান্য করলাম। হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং আপনারই দিকে প্রত্যাবর্তনস্থল।’”
এই আয়াতে স্পষ্টতই ‘মু’মিন’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে সেই ব্যক্তিদের জন্য যারা আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব ও রাসূলগণের ওপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করে।
৩. মুসলিম ও মু’মিনের মধ্যে পার্থক্য
মুসলিম ও মুমিন শব্দ দুটির মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট পার্থক্যটি পাওয়া যায় সূরা আল-হুজুরাতে। এখানে আল্লাহ মরুবাসী বেদুইনদের দাবির সমালোচনা করে বলেছেন:
[৪৯:০১৪] “মরুচারী আরবরা বলে, ‘আমরা ঈমান আনলাম’। তুমি বলো, ‘তোমরা ঈমান আনোনি (তু’মিনু), বরং তোমরা বলো— আমরা আত্মসমর্পণ (আসলামনা) করেছি; কারণ ঈমান এখনো তোমাদের হৃদয়ে প্রবেশ করেনি।’ আর যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো, তবে তিনি তোমাদের আমলসমূহের সওয়াব বিন্দুমাত্র লাঘব করবেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
আয়াতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আল্লাহ মরুবাসীদের ‘মুসলিম’ বলেছেন, কিন্তু ‘মু’মিন’ বলে স্বীকৃতি দেননি। কারণ তাদের হৃদয়ে এখনো ঈমান পরিপূর্ণরূপে প্রবেশ করে নি। অর্থাৎ:
- মুসলিম: বাহ্যিকভাবে আত্মসমর্পণকারী, আনুগত্যকারী
- মু’মিন: যার হৃদয়ে গভীর ঈমান প্রবেশ করেছে
৪. ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি হতে পারে
সূরা আল-বাকারায় হযরত ইব্রাহিম-এর একটি ঘটনা উল্লেখিত হয়েছে:
[২:২৬০] “আর স্মরণ করো, যখন ইব্রাহিম বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আপনি কীভাবে মৃতকে জীবিত করেন, তা আমাকে দেখান।’ তিনি বললেন, ‘তুমি কি তবে বিশ্বাস করো না (আওয়ালাম তু’মিন)?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ অবশ্যই, কিন্তু আমার অন্তর যাতে প্রশান্ত হয়।’”
এই আয়াতে দেখা যায় ইব্রাহিম ইতিমধ্যে মুমিন ছিলেন, কিন্তু তিনি তাঁর অন্তরকে আরও দৃঢ় করার জন্য আল্লাহর নিদর্শন দেখতে চাইলেন। এখান থেকে বোঝা যায় যে, ঈমানেরও বিভিন্ন মাত্রা রয়েছে এবং এর হ্রাস-বৃদ্ধি হতে পারে।
৫. পূর্ববর্তী নবীগণ ও তাঁদের অনুসারীরাও মুসলিম ছিলেন
কুরআনে বহুস্থানে পূর্ববর্তী নবীগণ এবং তাদের অনুসারীদেরকে ‘মুসলিম’ বলা হয়েছে। এটিই প্রমাণ করে যে, ‘মুসলিম’ হওয়ার জন্য শেষ নবী বা কুরআনের প্রতি বিশ্বাস শর্ত নয়; বরং আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণই যথেষ্ট।
নূহ
[১০:৭২] ‘অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে আমি তো তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাইনি। আমার প্রতিদান কেবল আল্লাহর কাছে এবং আমি আদিষ্ট হয়েছি যেন আমি আত্মসমর্পণকারীদের (মুসলিমীন) অন্তর্ভুক্ত হই।’
সুলাইমান
[২৭:৩১] তিনি সাবার রানীকে চিঠি লিখলেন: “‘আমার বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করো না এবং আত্মসমর্পণকারী (মুসলিমীন) হয়ে আমার কাছে উপস্থিত হও।’”
লূত-এর অনুসারীগণ
[৫১:৩৬] “আর আমি সেখানে একটি ঘর ছাড়া কোনো আত্মসমর্পণকারীদের (মুসলিমীন) পাইনি।”
ইব্রাহিম
[৩:৬৭] “ইব্রাহিম ইয়াহুদি ছিলেন না এবং নাসারাও ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ আত্মসমর্পণকারী (হানিফান মুসলিমান)।“
ঈসার শিষ্যগণ
[৩:৫২] “অতঃপর ঈসা যখন তাদের কুফরি অনুভব করলেন, তখন বললেন, ‘আল্লাহর পথে কারা আমার সাহায্যকারী হবে?’ হাওয়ারিগণ বলল, ‘আমরাই আল্লাহর সাহায্যকারী। আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি এবং আপনি সাক্ষী থাকুন যে, আমরা আত্মসমর্পণকারী (মুসলিমুন)।’”
ইউসুফ
[১২:১০১] “‘হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমাকে রাষ্ট্রক্ষমতা দান করেছেন এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছেন। হে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর স্রষ্টা! আপনিই ইহকাল ও পরকালে আমার অভিভাবক। আপনি আমাকে আত্মসমর্পণকারী (মুসলিমান) হিসেবে মৃত্যুদান করুন এবং আমাকে পুণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত করুন।’”
ইয়াকুবের সন্তানগণ
[২:১৩৩] “ইয়াকুবের যখন মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছিল, তখন কি তোমরা উপস্থিত ছিলে? যখন সে তার সন্তানদের বলেছিল, ‘আমার পর তোমরা কার ইবাদত করবে?’ তারা বলেছিল, ‘আমরা আপনার ইলাহ এবং আপনার পিতৃপুরুষ ইব্রাহিম, ইসমাইল ও ইসহাকের ইলাহ—সেই অদ্বিতীয় ইলাহেরই ইবাদত করব। আর আমরা তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণকারী (মুসলিমুন)।’”
ফিরআউনের জাদুকররা
[৭:১২৬] “‘আমাদের প্রতিপালক আমাদের কাছে আসার পর আমরা তাঁর নিদর্শনাবলীতে ঈমান এনেছি বলেই তো তুমি আমাদের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছ। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ওপর ধৈর্যের ধারা ঢেলে দিন এবং আত্মসমর্পণকারী (মুসলিমীন) হিসেবে আমাদের মৃত্যুদান করুন।’”
উপরের সবগুলো উদাহরণেই দেখা যায়, যারা পূর্ববর্তী নবীদের অনুসরণ করেছিল এবং আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল, তাদেরকে কুরআনে ‘মুসলিম’ বলে অভিহিত করা হয়েছে।
৬. আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা কুরআনের ওপর ঈমান এনেছে তারা মুমিন
[৫:৮৩] “আর রাসূলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, যখন তারা তা শোনে, তখন তুমি তাদের চোখগুলো অশ্রুবিগলিত দেখতে পাবে; কারণ তারা সত্যকে চিনে নিয়েছে। তারা বলে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা ঈমান এনেছি (আমান্না), অতএব আপনি আমাদের সত্যের সাক্ষীদের তালিকাভুক্ত করুন।’”
[৩:১৯৯] “আর নিশ্চয়ই আহলে কিতাবদের মধ্যে এমন লোকও আছে যারা আল্লাহর প্রতি বিনম্র হয়ে তাঁর ওপর ঈমান আনে এবং যা তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে আর যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে তার ওপরও ঈমান আনে। তারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে সামান্য মূল্যে বিক্রি করে না। তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে পুরস্কার রয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।”
[২৮:৫২-৫৩] “এর আগে আমি যাদের কিতাব দিয়েছিলাম, তারা এর (কুরআনের) ওপর ঈমান আনে। আর যখন এটি তাদের কাছে পাঠ করা হয়, তখন তারা বলে, ‘আমরা এর ওপর ঈমান আনলাম। নিশ্চয়ই এটি আমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রেরিত সত্য। আমরা তো এর আগেও আত্মসমর্পণকারী (মুসলিমিনা) ছিলাম।’”
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়: যারা পূর্ববর্তী কিতাবের ওপর ঈমান রেখেছিল, তারা আগে থেকেই ‘মুসলিম’ (আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী) ছিল। পরে যখন কুরআন তাদের কাছে পৌঁছাল এবং তারা এর সত্য উপলব্ধি করল, তখন তারা ‘মু’মিন’ হয়ে গেল।
সারসংক্ষেপ
কুরআনের দৃষ্টিকোণ থেকে ‘মুসলিম’ ও ‘মু’মিন’ শব্দদ্বয়ের ব্যবহার বিশ্লেষণ করলে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়:
১. মুসলিম হলো সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর কাছে নিজের ইচ্ছা সমর্পণ করে এবং আনুগত্য প্রকাশ করে। এটি পূর্ববর্তী সকল নবী ও তাদের অনুসারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মুসলিম হওয়ার জন্য শেষ নবী বা কুরআনের-এর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা শর্ত নয়।
২. মু’মিন হলো সেই ব্যক্তি যে শুধু আত্মসমর্পণই করে না, বরং তার হৃদয়ে আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব ও রাসূলগণের প্রতি গভীর ঈমান প্রবেশ করেছে। মুহাম্মদের সময়ে এবং তার পরবর্তী যুগগুলোতে, মু’মিন বলতে তাদেরকে বোঝানো হয় যারা তাঁকে শেষ নবী হিসেবে মেনে নিয়েছে এবং তাঁর আনীত গ্রন্থ আল-কুরআনের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করেছে।
